একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত হলো আইন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা এবং সঠিক আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া। সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার জন্য আইন এবং এর তৈরির পেছনের সাংবিধানিক পথপরিক্রমা জানা অত্যন্ত জরুরি।
আইন বলতেই আমাদের প্রথমে জানতে হবে এর সঠিক সংজ্ঞা কী। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদে 'আইন'-এর অত্যন্ত বিস্তৃত সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। উক্ত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: "আইন" অর্থ কোন আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল এবং বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যে কোন প্রথা বা রীতি (law means any Act, ordinance, order, rule, regulation, bye law, notification or other legal instrument, and any custom or usage, having the force of law in Bangladesh)।
আইনের সার্বজনীন সংজ্ঞায় আরও বলা যায়— "Law is the aggregate of rules set by man as political superior or sovereign to men as politically subject, if you violate this provision you will get punished for that." অর্থাৎ, রাজনৈতিকভাবে সার্বভৌম বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃক প্রবর্তিত নিয়মের সমষ্টিই হলো আইন, যা লঙ্ঘন করলে শাস্তির বিধান থাকে।
জন অস্টিনের মতবাদ: আইন সম্পর্কে বিখ্যাত আইন দার্শনিক স্যার জন অস্টিন বলেছেন— "Law is the command of sovereignty" (আইন হলো সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বা সার্বভৌমত্বের আদেশ)। তিনি তাঁর এই তত্ত্বে তিনটি মূল বিষয়ের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছেন: ১. নির্দেশ (Command), ২. বাধ্যবাধকতা বা কর্তব্য (Duty), এবং ৩. শাস্তি বা পরিণতি (Sanctions)।
বাংলাদেশের মতো একটি সংসদীয় গণতন্ত্রে আইন প্রণয়নের পদ্ধতি বুঝতে হলে সংবিধানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ বিশেষভাবে অনুধাবন করতে হবে:
সংবিধানের ৮০(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সংসদে প্রণীত প্রত্যেকটি প্রস্তাব 'বিল' (Bill) আকারে উত্থাপন করতে হয়। এই বিলগুলো সাধারণত দুই ভাগে বিভক্ত:
সংসদ সচিবালয় বিলটি প্রাপ্তির পর তা স্পিকারের নিকট পেশ করেন। এরপর স্পিকার সংসদে উপস্থাপনের জন্য একটি নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করেন এবং সেই নির্ধারিত দিনে বিলটি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হয়। এই পর্যায়টিকে বলা হয় First Reading (প্রথম পাঠ)।
প্রথম পাঠের পর বিলটির ওপর বিস্তারিত আলোচনার জন্য আরেকটি তারিখ ধার্য করা হয়। এই সময়ের আলোচনাকে বলা হয় Second Reading (দ্বিতীয় পাঠ)। দ্বিতীয় পাঠের সময় বিলটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনার জন্য কিংবা জনমত যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে নিম্নলিখিত যেকোনো একটি স্থানে পাঠানো হতে পারে:
সেকেন্ড রেডিংয়ের পর যদি বিলটিতে কোনো সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়, তবে সংশোধনীর কাজ শেষ হওয়ার পর বিলটি পুনরায় সংসদে বিবেচনার জন্য পেশ করা হয়। এই বিবেচনা পর্বটিকে বলা হয় Third Reading (তৃতীয় পাঠ)। তৃতীয় পাঠ শেষে বিলটি চূড়ান্ত ভোটের জন্য স্পিকারের মাধ্যমে সংসদে তোলা হয়।
| আইন প্রণয়নের পর্যায় | কার্যাবলী ও প্রক্রিয়া |
|---|---|
| First Reading | স্পিকার কর্তৃক ধার্য তারিখে সংসদে বিল উত্থাপন। |
| Second Reading | বিল নিয়ে ব্যাপক আলোচনা, স্থায়ী/বাছাই কমিটিতে প্রেরণ বা জনমত যাচাই। |
| Third Reading | সংশোধনী গ্রহণ/বর্জন শেষে চূড়ান্ত বিবেচনার জন্য পেশ এবং ভোটাভুটি। |
বিল পাসের সময় স্পিকার আহ্বান জানান: "যারা প্রস্তাবের পক্ষে আছেন, 'হ্যাঁ' বলুন; যারা প্রস্তাবের বিপক্ষে আছেন, 'না' বলুন।" বিল পাসের ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকারি বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়ে থাকে, যেখানে স্পিকার ঘোষণা করেন— "হ্যাঁ জয়যুক্ত হয়েছে।" বিল পাস হওয়ার পর স্পিকার তাতে স্বাক্ষর প্রদান করেন। এরপর সংবিধানের ৮০(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিলটি সম্মতির জন্য রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হয়।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও সময়সীমা:
• অনুচ্ছেদ ৮০(৩): রাষ্ট্রপতির নিকট বিল পেশ করার ১৫ দিনের মধ্যে তিনি তাতে সম্মতিদান করবেন কিংবা অর্থবিল ব্যতীত অন্য কোনো বিলের ক্ষেত্রে বিলটি বা এর বিশেষ বিধান পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়ে একটি বার্তার মাধ্যমে সংসদে ফেরত পাঠাতে পারবেন। রাষ্ট্রপতি তা করতে অসমর্থ হলে উক্ত মেয়াদের অবসানে বিলটিতে সম্মতিদান করেছেন বলে গণ্য হবে।
• অনুচ্ছেদ ৮০(৪): রাষ্ট্রপতি বিলটি সংসদে ফেরত পাঠালে, সংসদ রাষ্ট্রপতির বার্তাসহ তা পুনর্বিবেচনা করবে। সংশোধনীসহ বা সংশোধনী ছাড়া পুনরায় বিলটি গৃহীত হলে তা রাষ্ট্রপতির নিকট উপস্থাপিত হবে এবং ৭ দিনের মধ্যে তিনি সম্মতিদান করতে বাধ্য থাকবেন; অন্যথায় উক্ত মেয়াদের অবসানে সম্মতি দিয়েছেন বলে গণ্য হবে।
• অনুচ্ছেদ ৮০(৫): সংসদ কর্তৃক গৃহীত বিলটিতে রাষ্ট্রপতি সম্মতিদান করলে বা সম্মতিদান করেছেন বলে গণ্য হলে তা পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হবে এবং দেশের 'সংসদের আইন' হিসেবে অভিহিত হবে।
সংবিধানসম্মত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই একটি কার্যকর আইন প্রণীত হয়। জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই সাংবিধানিক আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সঠিক বাস্তবায়ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
| ফজর | ৪:০০ - ৪:১৫ মিনিট ভোর |
|---|---|
| যোহর | ১:১৫ - ১:৩০ মিনিট। দুপুর |
| আছর | ৫:১৫ - ৫:৩০ মিনিট বিকাল |
| মাগরিব | ৬:৫০ - ৭:০০ মিনিট সন্ধ্যা |
| এশা | ৮:৩০ - ৮:৪৫ মিনিট রাত |
| জুম্মা | ১:১৫ - ১:৩০ মিনিট দুপুর |

